Thursday, October 5, 2017

রোহিঙ্গা শিবির থেকে বলছি- ০৬/১০/২০১৭-লিখেছেন আবদুস সামাদ, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

রোহিঙ্গা শিবির থেকে বলছি- লিখেছেন আবদুস সামাদ, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট,(৩৪ তম বিসিএস) জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম(বর্তমানে টেকনাফ, উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবির এ জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার অধীনে কর্মরত)- তার ফেসবুক প্রোফাইল হতে নেয়া রোহিঙ্গা শিবিরের দিনপঞ্জি-
তারিখঃ ০৪/১০/২০১৭
#রোহিঙ্গা_শিবির_থেকে_বলছি
গত ১৪/০৯/১৭ তারিখে যখন ত্রাণ বিতরণের জন্য উখিয়া উপজেলায় ৭টি এবং টেকনাফ উপজেলায় ৫ টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয় তখনো ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থায় এলোমেলো অবস্থা। হঠাৎ করে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ। রাস্তায় ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে তাই এরাও রাস্তায় ভীড় করছে। এদের প্রস্তাবিত ২ হাজার একর ক্যাম্প এরিয়ার মধ্যে ( বর্তমানে এটা ৩ হাজার একর করা হয়েছে) নিয়ে আসার জন্য ত্রাণ ক্যাম্পের ভিতরে আনার ব্যবস্থা করা হয়। আর সে উদ্দেশ্যেই ত্রাণ বিতরণ পয়েন্টগুলো করা হয় যাতে এরা ক্যাম্প এরিয়ার ভিতরেই ত্রাণ পায় এবং এখানেই ছাপড়া ঘর তৈরি করে থাকা শুরু করে। মোট বারটি ক্যাম্পের মধ্যে কুতুপালং অস্থায়ী ক্যাম্প-১ এ আমার দায়িত্ব পালন করার জন্য আদেশ হয়। 
ঐদিন থেকেই ঐ পয়েন্ট থেকে কাজ শুরু করি। বৃষ্টি কাদায় মাখামাখি হয়ে যখন প্রথম ত্রাণের গাড়িটি ওখানে নিয়ে আসি, ত্রাণের জন্য সে কি হাহাকার, হুড়োহুড়ি। পুলিশ-আনসার নিয়ে কোন প্রকারে শেষ করলাম। ততক্ষণে আমার বুঝা হয়ে গিয়েছিল এভাবে কাজ চালানো সম্ভব নয়। পরের গাড়িটি স্টপ করিয়ে প্রথমে বাশ আনিয়ে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে দিয়ে লাইন তৈরি করালাম। আর সাথে সাথে আরেকজনকে পাঠালাম কাগজ আনাতে। চালু করলাম টোকেন প্রথা। ঘরে ঘরে যেয়ে আমার লোক টোকেন দিয়ে আসবে, আর সেই টোকেন নিয়ে লাইনে দাঁড়ালে ত্রাণ পাবে। খুব কাজে দিল, কাজ সহজ হয়ে গেল। সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো কিছু মহিলা। এদের কোলে খুবই ছোট ছোট বাচ্চা থাকে, ত্রাণের জন্য কান্নাকাটি করে। সহানুভূতি দেখিয়ে কয়েকজনকে টোকেন ছাড়াই দিয়েছি। বিধিবাম, যারা এই সুযোগ পেয়েছে, অর্থাৎ টোকেন ছাড়া ত্রাণ পেয়েছে তারা রোজ বিরক্ত করা শুরু করল। বুঝলাম, এদের অভাব আর স্বভাব দুটাই নষ্ট। এদের তাড়িয়ে দিতে শুরু করলাম আর দিন দিন এদের উৎপাত কমে আসতে লাগল। 
আজ দুপুরের দিকে দেখি এক মহিলা বাচ্চা কোলে দাড়িয়ে আছে পাশেই। কেমন যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একজন সোলজারকে নির্দেশ দিলাম তাড়িয়ে দিতে। কিছু সময় পর সে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসল। বাচ্চা কোলে, জোড়ও করতে পারেনি অথবা তার চোখে এমন কিছু ছিল যা তাকে ব্যর্থ করে দেয়। সে এসে আমাকে জানাল মহিলা যাচ্ছে না। প্রচন্ড রাগ নিয়ে আমি নিজেই গেলাম সে মহিলাকে তাড়াতে। কাছাকাছি যেয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও কিছু বলতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, ত্রাণ চাই কিনা?? কিছু বলল না। কোলের বাচ্চার কথা জিজ্ঞাসা করা সাথে সাথেই মহিলাটি কেঁদে দিল। সন্দেহ হল, এবার বাচ্চাটির দিকে ভাল করে তাকালাম। বাচ্চাটি মারা গেছে ততক্ষণে বুঝলাম। এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় কখনো পরেছি বলে মনে নাই। হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছু সময়। পরে আমার বসার জায়গার কাছে নিয়ে এসে কথা বললাম। ততক্ষণে সে সোলজারের চোখের কোণে পানি। শুনলাম ঘটনা। বাচ্চাটি নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, লাভ হয়নি। এম্বুলেন্সে করে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেছে। বাসা আরেকটু সামনে। এই মৃত বাচ্চা নিয়ে কি করবে বুঝতে পারছে না। মানি ব্যাগ বের করে কিছু টাকা দিলাম। এছাড়া কিইবা করার ছিল। এক তার্কিশ গ্রুপ তখন ত্রাণ দিচ্ছিল। ওরাও কিছু টাকা দিল সমাহিত করার জন্য। বিদায় দিলাম। আমার মা ব্যতীত কোন মৃত মানুষের মুখ আমি দেখি নাই। দেখতাম না সহ্য করতে পারি না বলে। এই শিশুটির মৃত মুখ দেখলাম আজ। রোহিঙ্গা ক্যাম্প আমাকে অনেক কিছুই দেখাচ্ছে।
সারাদিন তেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই ত্রাণ বিতরণ শেষ হয়েছে। তার্কিশ গ্রুপটি লাইনের বাইরে ত্রাণ দিয়ে কিছুটা এলোমেলো করেছিল যা দ্রুতই ঠিক করে ফেলি আর ওদের কড়া ভাবে নিষেধ করে বিরত করি। প্রতিদিন কাজ শেষে যখন গোছগাছ করি, সব পিচ্চি পোলাপাইন আশেপাশে জড়ো হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আজ এক সোলজার মজার এক কাজ করল। সবাইকে মাঠের মধ্যে লাইনে দাড় করালো টোকেন দেয়ার কথা বলে। সবাই দেখলাম খুব উৎসাহ নিয়ে লাইনে দাঁড়ালো। এরপর এদের দিয়ে ছড়া বলানো শুরু করল। এরপর আর কিছু করতে হয়নি, নিজেরাই গান, ছড়া আর যা যা পারে করা শুরু করল। ততক্ষণে আমরা গোছগাছ করে গাড়িতে উঠে গেছি, আর পিচ্চিদের কাজ ওরা করতে ছিল।

No comments:

Post a Comment